Demo
নাঈম নিজামঃ নিজামুদ্দিনের নিভৃত গলিতে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দিন আগে খুঁজছিলাম মির্জা গালিবের কবর।
অনেকের কাছে জানতে চাইলাম। কেউ বলতে পারল না। খুঁজে পেলাম গালিব একাডেমি। তারা একটা ধারণা দিল, কীভাবে যেতে হবে।
দক্ষিণ দিল্লির হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া দরগাহ-এর পাশে চৌষট্টি খাম্বার কাছে এই সমাধিস্থল। ছোট, গম্বুজযুক্ত পারিবারিক কবরস্থানটি সংরক্ষণ করে আগা খান ট্রাস্ট ফর কালচার। এখানে গালিবের পাশেই শায়িত তাঁর স্ত্রী উমরাও বেগম এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। আমি গালিবের কবর জিয়ারত করলাম। স্মরণ করলাম সেই বিখ্যাত উর্দু ও ফারসি কবিকে, যিনি আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
দেখলাম কবরের চারপাশে এক ধরনের নীরবতা। যেন শব্দও এখানে এসে ধীরে কথা বলে। ভাবছিলাম গালিবের শায়েরির গভীরতা, সেই অনন্ত বেদনা আর প্রেম, আর জীবনের তীব্র অনুভব নিয়ে। যা সময় পেরিয়েও আজও হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।
মনে পড়ে গালিবের সেই অমর শায়ের—
হাজারোঁ খোয়াহিশেঁ অ্যায়সি কে হার খোয়াহিশ পে দম নিকলে,
বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে।
বাংলা অর্থ : হাজারো ইচ্ছা এমন, যার প্রতিটির জন্য দম আটকে আসে; আমার বহু স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তবুও মনে হয় কিছুই পূরণ হয়নি । “
একজন আমাকে দেখিয়ে দিলেন মুঘল প্রেমের আরেক ইতিহাস জাহানারা বেগমের কবর। তিনি ছিলেন সম্রাট শাহজাহান কন্যা, এক নিবেদিতপ্রাণ সন্তান। জীবনের শেষ সময়ে, যখন পিতা বন্দী ভাই আওরঙ্গজেবের হাতে, তখন এই জাহানারাই ছিলেন বাবার একমাত্র সঙ্গী, তাঁর সেবায় নিবেদিত। অথচ অমর প্রেমের নায়ক তাজমহলের সৃষ্টিকারী একদিন এই মেয়ের প্রেমিককে খুন করেছিলেন।
ক্ষমতা, প্রেম, বেদনা সব এক অদ্ভুত জালে বাঁধা। যে সম্রাট ভালোবাসার স্মারক হিসেবে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, সেই শাহজাহানই আবার রাজনীতি ও রাজসিক কঠোরতার বাস্তবতায় কন্যার প্রেমিককে মৃত্যু দন্ড দেন । ইতিহাসের এক নির্মম বৈপরীত্য।
আমি সম্রাট শাহজাহানের হতভাগা কন্যা জাহানারার কবর জিয়ারত করলাম। মনে হলো, মানুষের জীবন আসলে গল্পের চেয়েও বেশি নাটকীয়। নিজামুদ্দিনে কবির নিঃসঙ্গতা, রাজকন্যার ত্যাগ, আর সম্রাটের দ্বৈত সত্তা, সব একসঙ্গে মিশে আছে। তাইতো মির্জা গালিব লিখেছেন—
“তুমি প্রেমে পড়েছ, আবার সম্মানও চাও?
ভালোবেসেছো, আবার মর্যাদাও চাও?
তুমিও বড়ই নাদান, গালিব—বিষ খেয়েছো, আবার বাঁচতেও চাও।”
সব শেষে খোঁজ নিলাম মির্জা গালিব ও জাহানারার কবর কেন নিজামুদ্দিনে? ইতিহাস বলে, তারা নিজেরা হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জীবদ্দশায়ই তারা ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, এই দরগাহের কাছাকাছি যেন তাঁদের চিরনিদ্রার ঠিকানা হয়। সেই ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছে। ইতিহাস, কবিতা আর আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনস্থল দেখলাম ঘুরতে ঘুরতে।
নাঈম নিজাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক।
Leave A Reply

সাইটম্যাপ

যোগাযোগের ঠিকানা