Demo

সময়ের চক্রে আবার ফিরে এলো বাঙালির প্রাণের উৎসবÑ পহেলা বৈশাখ। নতুন সূর্যের দীপ্তি আর লাল-সাদার আবহে আজ শুরু হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। এই দিনটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মহামিলন। ভেদাভেদের সব দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে এক অনন্য সংহতিÑ যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা মতের বিভাজন মুছে গিয়ে জায়গা করে নেয় একাত্মতার উজ্জ্বল অনুভব।

ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ জেগে উঠবে উৎসবের আমেজে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি সংগীত যেন নতুন বছরের প্রথম স্পন্দন ছড়িয়ে দেয় প্রকৃতি আর মানুষের মনে। সুরের মূর্ছনায় উচ্চারিত হয়Ñ ‘এসো হে বৈশাখ’ পুরনো সব গ্লানি, ক্লান্তি আর সংকীর্ণতা ধুয়েমুছে ফেলার আহ্বান জানিয়ে। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা রাজপথে এনে দেবে প্রাণের উচ্ছ্বাস; লোকজ মোটিফ, মুখোশ, প্রতীকী উপস্থাপনায় ফুটে ওঠে বাঙালির ইতিহাস, সংগ্রাম আর সংস্কৃতির বর্ণিল রূপ।

শুধু রাজধানী নয়, গ্রাম থেকে শহরÑ সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে বৈশাখের রঙিন ঢেউ। মেলা, লোকজ আয়োজন, নাচ-গান, আবৃত্তি, পটগান, জারি-সারি, ভাটিয়ালির সুরে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। হালখাতার মাধ্যমে নতুন অর্থবছরের সূচনা, ব্যবসায়ীদের নতুন আশার পথচলা, আর ঘরে ঘরে পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পায়েস, খই-মুড়কির আপ্যায়নÑ সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে এই দিনে।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ঐক্য, সম্প্রীতি ও নতুন প্রত্যয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। এক বাণীতে তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ

আমাদের সর্বজনীন উৎসব, যা ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে মিলনের বন্ধনে আবদ্ধ করে। দেশবাসীসহ বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে তিনি নববর্ষের উষ্ণ শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অনন্য প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক বাণীতে তিনি বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষীদের শুভেচ্ছা জানান।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সাজানো হয়েছে বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন। দিনভর সাংস্কৃতিক আবহে মেতে উঠবে নগরজীবন, যেখানে ঐতিহ্য আর সমকাল মিলবে এক সুরে। বরাবরের মতোই ছায়ানট আয়োজন করেছে রমনার বটমূলে প্রভাতি অনুষ্ঠান। ভোর সোয়া ৬টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে রয়েছে ৮টি সম্মেলক গান, ১৪টি একক সংগীত ও দুটি আবৃত্তি। দুই শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে এই পরিবেশনা রূপ নেবে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মহাসমুদ্রে। দুই ঘণ্টার এই আয়োজন একযোগে সম্প্রচার করবে বিটিভি, যা ঘরে বসেও উপভোগ করতে পারবেন দর্শকরা।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করেছে ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। সকাল ৯টায় চারুকলার উত্তর গেট থেকে বের হয়ে শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, দোয়েল চত্বর হয়ে পুনরায় চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে এই শোভাযাত্রা। লোকজ মোটিফ, মুখোশ ও বাদ্যযন্ত্রের বর্ণিল ব্যবহারে শোভাযাত্রাটি হয়ে উঠবে বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ। এর আগে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে নাচ-গানসহ নানা আয়োজনে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়েছে চারুকলা পরিবার।

এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমি ৫ দিনব্যাপী বৈশাখী আয়োজন করেছে। ঢাক-ঢোল, লাঠিখেলা, জারিগান, সারিগান, পটগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা, কবিগান, গাজীর গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া, পুতুলনাচ ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে মুখর থাকবে একাডেমি প্রাঙ্গণ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানমালা চলবে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত।

বাংলা একাডেমিতেও রয়েছে দিনব্যাপী কর্মসূচি। নজরুল মঞ্চে আলোচনা, নববর্ষ বক্তৃতা, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা ও ‘বইয়ের আড়ং’ নামের বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন দেশের বিশিষ্টজন ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে অংশ নেবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীরা। একই সঙ্গে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ধানমন্ডিতে দিনব্যাপী আয়োজন করছে শোভাযাত্রা, গান, আবৃত্তি ও নৃত্য।

ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে চ্যানেল আই আয়োজন করছে ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’, যেখানে সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যে অংশ নেবেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এবং ছায়ানট যৌথভাবে আজ সকাল সাড়ে ৮টায় রমনা বটমূলে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। পাশাপাশি জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা আয়োজনে যুক্ত হয়েছে।

সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ সিএমপির

চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিলকে কেন্দ্র করে আবার ফিরছে পহেলা বৈশাখের আয়োজন। নানা মতপার্থক্য ও টানাপড়েন শেষে এবার জেলা প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিএনপিপন্থি বিভিন্ন পক্ষ একসঙ্গে বর্ষবরণের আয়োজন করছে। একই সঙ্গে সিআরবির শিরীষতলাতেও পৃথক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

এবার ডিসি হিলে আয়োজন ঘিরে শুরুতে জেলা প্রশাসন ও ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’-এর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ১৯৭৮ সাল থেকে পরিষদটি সেখানে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে এলেও এবার জেলা প্রশাসন নিজ উদ্যোগে আয়োজনের ঘোষণা দেয়। এতে বিএনপিপন্থি সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাস যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে অতীতে অংশ নেওয়া কয়েকটি সংগঠন সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এ অবস্থায় পরিষদটি ২ এপ্রিল পৃথক সভা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয়। নববর্ষ উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নগরজুড়ে দেড় কিলোমিটার সড়কে আলপনা আঁকা হয়েছে। সার্কিট হাউস থেকে লাভ লেন হয়ে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত এই রঙিন আয়োজন উৎসবের মাত্রা বাড়িয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়েও কড়া অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। ডিসি হিল ও সিআরবিকে কেন্দ্র করে চার স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হবে। সিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া জানিয়েছেন, কোনো নির্দিষ্ট হুমকি না থাকলেও সুশৃঙ্খল আয়োজন নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ক্রাইম ডিভিশন, ডিবি, সিটি এসবি, সোয়াত ও ট্রাফিক বিভাগ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

তবে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে সব অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। সূর্যাস্তের পর কোনো কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।

চৈত্রসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বিদায় নিল পুরনো বছর

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’Ñ এই প্রত্যয়ে চৈত্রসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বিদায় নিল বাংলা সন ১৪৩২। বছরের শেষ দিনে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা আয়োজনে পুরনো বছরের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতি নেয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ। গতকাল সোমবার শিল্পকলা একাডেমিতে চৈত্রসংক্রান্তি ১৪৩২ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ৫ দিনব্যাপী বৈশাখী অনুষ্ঠানমালার। আয়োজনের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। লোকশিল্প প্রদর্শনী, অর্কেস্ট্রা, ধামাইল নৃত্য, জারি-সারি, পটগান, পুঁথিপাঠ ও যাত্রাপালায় মুখর ছিল একাডেমি প্রাঙ্গণ। এদিকে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আয়োজন করে শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করেন কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। নাট্যদল পালাকার আয়োজন করে ‘পালা-মেলা’, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে নাচ-গান ও লোকজ পরিবেশনায় উদযাপিত হয় চৈত্রসংক্রান্তি। সব মিলিয়ে লোকজ সংস্কৃতি, আপ্যায়ন ও আনন্দ আয়োজনে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন প্রত্যাশায় বরণে প্রস্তুত দেশ।

Leave A Reply

সাইটম্যাপ

যোগাযোগের ঠিকানা