নাসির উদ্দিনঃ রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মানুষকে সংগঠিত করে। এজন্য তার নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচি লাগে। এই নীতি আদর্শের পক্ষে অবস্থানের একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যাও তাকে দিতে হয়। এটা তার রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ। একটা দলকে সফল হতে হলে তার স্ট্রং রাজনৈতিক ন্যারেটিভ লাগে। যে দলের বয়ান যত স্বচ্ছ ও গণমূখী হয়, সে দল তত দ্রুত সফল হয়।
দেশের রাজনীতির বড়ো দুর্বলতা হচ্ছে স্বচ্ছ ন্যারেটিভের অভাব। এরচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হলো আদর্শহীনতা। এই দুইটি ঘাটতির জন্য দলগুলো উপযোগিতা ধরে রাখতে পারেনা। অথচ এদেশের জনগণ দুইটি স্বাধীনতা, তিনটি গনঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীতে যা বিরল। ইংল্যান্ড ১৬৪২ থেকে ১৬৬০ সময়কালে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গনতান্ত্রিক বিপ্লব করেছে। ১৮ বছরের এই ইংরেজি বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আর ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব হয়েছে ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯, ১০ বছরব্যাপী। ফ্রান্সকেও গনতন্ত্রের জন্য আর রাস্তায় নামতে হয়নি।
মাত্র ১৩ জনের একটি বিদ্রোহ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল মার্কিন বিপ্লব। ১৭৬৫ থেকে বিপ্লবের তৎপরতা শুরু ১৭৯১ সালে পূর্ণতা লাভ করে। দীর্ঘ ২৬ বছরের সংগ্রাম। আমেরিকান এই বিপ্লবকেও আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশ্বের প্রভাবশালী এই তিন দেশের বিপ্লব ছিল সংগঠিত ও পরিকল্পিত। সেই বিপ্লবের ন্যারেটিভের ওপর আজও ওরা দাঁড়িয়ে আছে।
দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষদের। পাঁচবার রক্ত দিয়ে বিপ্লব অভ্যুত্থান সফল করেও মুক্তির পথ খুঁজে পায়নি। কারণ নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের রাজনৈতিক অদুরদর্শিতা। একটা সংগ্রাম শুরুর আগে মানুষের সামনে সংগঠিত রাজনৈতিক ন্যারেটিভ উপস্থাপন করতে হয়। এবং একই ন্যারেটিভের ভিত্তিতে রাষ্ট্র রচনা করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ৫ বিপ্লবেরও সঠিক কোনো ন্যারেটিভ ছিলনা। ফলে রাষ্ট্র গঠনের বেলায়ও কোনো ন্যারেটিভ বা আদর্শ কাজ করেনি। বরং রাষ্ট্রকে দখল করে লুটপাট ও একনায়কতন্ত্র কায়েমের নৈরাজ্য চলেছে যুগের পর যুগ।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছি, দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসও উদযাপন করেছি, দেখেছি। ৩৬ জুলাইয়ের পর নতুন রাজনীতির ন্যারেটিভ তৈরির বয়ান দেখেছি। বাস্তবতা হচ্ছে রক্তদাতা দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ এসব উদযাপনের অংশীদার হয়না থাকেনা। কারণ বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বে থাকা শক্তিগুলো বিপ্লবের দখলদারিত্ব নিয়ে নেয়। জনগণের কোনো অংশীদারত্ব স্বীকার করা হয় না। বিপ্লব বেহাত হয়ে উচ্চ শ্রেণির দখলে চলে যায়। এজন্য কোনো বিপ্লব ও অভ্যুত্থান আর সর্বজনীন থাকেনা।
ফলে জনগণ বিপ্লবের সাথে তার নৈকট্য ফিল করে না। কারণ ন্যারেটিভহীন ঐক্য দ্বারা মানুষকে উত্তেজিত করে কেবল ব্যবহার করা হয়। আর জনগণও রক্ত বিলিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনে বিজয়ের মিছিলের আর দেখা পায়না। দিনশেষে সে তার শূন্য ঘরে ফিরে যায়। রাজনীতি ও রাষ্ট্র তাকে আর কোনকিছুতে জিজ্ঞেস করে না। আর রাজনীতিতে একদা পরিত্যক্ত ও পরাজিতরা সেই উপেক্ষিত বিক্ষুব্ধ মানুষের পাশে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। রচিত হয় প্রতিবিপ্লবের বা বিপ্লব বিরোধীতার পথ। এভাবেই প্রায়শ্চিত্ত না করেই অসৎ রাজনীতি জনপরিসরে জায়গা পেয়ে যায়। এদেশে জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সবাই পরিত্যক্ত পরাজিত হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির মিথ্যা পাটাতনে রাজনীতিতে আবার ফিরেও এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কতকাল এই জাতি এই দুর্দশা বয়ে বেড়াবে?
নাসির উদ্দিনঃ সাংবাদিক ও লেখক। ফেইস বুক থেকে।

