নাসির উদ্দিনঃ বিরুদ্ধ পরিবেশে নিখুঁত প্ল্যানিং, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দীর্ঘ পরিশ্রম এবং সংগঠনের আধুনিকায়ন ডাকসুতে শিবিরের সাফল্যের মূল ভিত্তি। এই পরিবর্তন ঢাবি কেন্দ্রীক ছাত্র রাজনীতিকে এককেন্দ্রিক করে তুলবে। অন্যরা ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে এরচেয়ে বেশী ডেডিকেশন লাগবে। এসব বিবেচনায় দেশের সার্বিক রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে এবারের জয় পরাজয়।
রাজনীতিতে একসময় কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি চর্চা করতো। নীতি নৈতিকতা, সাবলীল জীবন যাপন ও জ্ঞানচর্চায় তারা চিন্তাশীল ছাত্রদের আকৃষ্ট করতো। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীও শুরু থেকেই ক্যাডার ভিত্তিক দল পরিচালনা করছে। এমনকি তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোও। ফলে বরাবরই ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত।
অন্য সংগঠনগুলোর সাথে শিবিরের প্রধান পার্থক্য এখানেই। ফলে একটি সংগঠিত শক্তির সাথে অসংগঠিত শক্তির নির্বাচনী লড়াই জমেনি। দ্বিতীয়ত: এমন নয় যে, হুট করেই শিবির সফল হয়েছে। প্রতিকূল অবস্থায় তারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করে কুশলি ও দক্ষ হয়ে ওঠেছে। এই কৌশলে দক্ষ কর্মীদের তারা ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকিয়েছে। লীগের দায়িত্ব পালনের নামে নিজেদের কর্মীদের হল ও অন্যান্য সুবিধা করে দিয়েছে। আর সাধারণ ছাত্রদের সাথে গভীর নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে। এই বন্ধন ধরে রেখে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, নোট সরবরাহ, টিউশন জোগার, পারিবারিক খোঁজখবর রাখা ও আর্থিক সংকটে পাশে থাকার কাজ করেছে। অনেককে ধর্মীয় ও নানা কল্যাণধর্মী কাজে যুক্ত করেছে। এই চেইন ধরেই ছাত্রলীগের ভেতরে গড়ে ওঠে শিবিরের গভীর বন্ধন। লীগের ভেতরের শিবিরের সেই কর্মীরা সময়মত চেইনের টানে জুলাই আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগের গর্ভে শিবিরের গড়ে ওঠা এবং লড়াই বরং বেশী সহজ ছিল।
এছাড়া ছাত্রলীগের রাজনীতিতে বসবাস করে ওরা নিজেদের সেক্যুলার স্টাইলে চলতে অভ্যস্ত করেছে। দলের নির্দেশেই সেক্যুলার রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে শিবির কর্মীরা। ফলে শিবিরের যে রক্ষনশীল সাংস্কৃতিক চেহারা, সেটি বর্তমান নেতাদের মধ্যে ছিল না। পোশাক পর্দা রক্ষণশীলতা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার নির্দেশনা ছিল দল থেকে। এভাবেই ওরা সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। এর বাইরে ব্যক্তিগত বিশ্বস্ততার ইস্যুটিও ছাত্র ছাত্রীদের আকৃষ্ট করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে শিবিরের ভূমিকা ছাত্রদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। আর গত এক বছর ধরে শিবির ক্যাম্পাসে প্রি ফেইস ক্যাম্পিং করেছে। এখানেই সংগঠনটি ডাকসু ও হলের নেতৃত্বকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করে ফেলেছে। অন্যান্য সংগঠনগুলো যা করতে চাঁদরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে।
ডাকসু নিয়ে শিবিরের আরও মাস্টারপ্ল্যান আছে। ক্যাম্পাসে ছাত্রদের দীর্ঘকালীন ফ্রীডমের ইস্যুটিকে ওরা গুরুত্ব দিতে চায়। আগেকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় টাইপের কারাগার পরিকল্পনার বিপরীতে সহনশীলতা এবং ছাত্র সন্তুষ্টির দিকে মনযোগ দেবে। প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাডারভিত্তিক এই সংগঠনের সাথে অন্যরা ভবিষ্যতে পেরে ওঠবে কি?
আরেকটি প্রধান ইস্যু হচ্ছে দেশে ক্রমবর্ধমান মাদ্রাসা। দেশে মাত্র ২২৫৪ কলেজের বিপরীতে ২১ হাজার ( কওমী ১৯’১৯৯ ও ইবতেদায়ী ১৯৭৮টি) মাদ্রাসা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কলেজের চেয়ে মাদ্রাসা ছাত্রের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
নাসির উদ্দিন, লেখক ও সাংবাদিক । ফেইস বুক থেকে।

