“১৯৯০ সালে আমি যখন কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গিয়েছিলাম, তখন বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলানা শেখ আব্দুল হালিমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট, ইসলাম সম্মত সকল বিধি মান্য করে বঙ্গবন্ধুকে দাফন করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ঐ রাতে ঘরে ফিরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরবি ভাষায় একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। ঐ কবিতাটি আমি তাঁর কাছ থেকে লিখে নিয়ে এসেছিলাম এবং কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করে সাপ্তাহিক ঢাকা পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলাম।
আজ মৌলানা শেখ আব্দুল হালিমের কাছে শোনা অন্য একটি ঘটনার কথা লিখছি। আমি মৌলানা শেখ আব্দুল হালিমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকেতো আপনি খুব ছোটো বেলা থেকে দেখেছেন। জেনেছেন। তাঁর সম্পর্কে এমন কোনো ঘটনার কথা কি আপনি আমাকে বলবেন, যে ঘটনাটি আপনার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল, তাঁর সম্পর্কে ভাবতে গেলে যে ঘটনাটির কথা আপনার খুব মনে পড়ে? যে ঘটনাটি আপনি ছাড়া অন্য কেউ জানে না?
মৌলানা হালিম আমার প্রশ্নটি গভীর মনযোগ সহকারে শুনলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে তিনি কিছুক্ষণ চুপকরে বসে থাকলেন। মনে হলো তিনি স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিয়েছেন। আমি চুপ করে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তাঁর কপালে চিন্তার বলিরেখা। ঠোঁট দুটি কাঁপছে তাঁর। তিনি চোখ মেললেন। আধো আলো আধো অন্ধকারে আমি লক্ষ্য করলাম – তাঁর চোখের পাতায় অশ্রু জমেছে।
তাঁকে সহজ হতে সাহায্য করে আমি বললাম, কিছু কি মনে পড়লো? আপনার চোখে জল কেন?
তিনি বললেন, একটা ঘটনার কথা আমার খুব মনে পড়ে, আর সেই ঘটনাটির কথা মনে পড়লেই আমার কষ্ট হয়, আমার চোখে পানি এসে যায়।
আমি তাঁর মুখ থেকে ঐ ঘটনাটি শুনবার জন্য কিছুটা উত্তেজিত বোধ করি। বলি, বলুন শুনি ঐ ঘটনাটার কথা। আমার বিশ্বাস ঐ ঘটনাটির কথা, যা আপনি গোপনে বয়ে চলেছেন আপনার বুকের ভিতরে, সেই ঘটনাটির কথা আমার কাছে প্রকাশ করলে আপনার বুকটা হালকা হবে।
একথা শুনে তিনি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন– আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধুকে আমি একটা কষ্ট দিয়েছি। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই এরকম একটা অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে চলেছে। আমার কেবলই মনে হয়, আমার এই কাজটা করা ঠিক হয়নি।
আমি বললাম, এমন কি কষ্ট আপনি দিয়েছেন তাঁকে, যার জন্য আপনি এখন কষ্ট পাচ্ছেন?
তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু খুব জাঁক জমক করে তাঁর চল্লিশার (চেহলাম) আয়োজন করেছিলেন। আমাকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁর পিতার মঙ্গল কামনা করে কোরান খতমে অংশ নেবার জন্য। আমি তাঁকে বললাম, তুমি প্রচুর অর্থ খরচ করে তোমার পিতার জন্য যে বিশাল আয়োজন করেছো– এতো অর্থ তুমি কীভাবে উপার্জন করেছো, এই নিয়ে আমার মনের মধ্যে কিছু সংশয় তৈরি হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু আমার কথা শুনে একটু ব্যথিত হন।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি জাতির পিতা, দেশের প্রসিডেন্ট, তিনি দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী– আমার ওপর রাগ হতে পারেন। কিন্তু না। আমার কথা শুনে তিনি একটুও রাগ হলেন না, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হালিম, সত্য কথা বলার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি প্রকৃত ঈমানদার মুসলমান। অন্য কোনো মৌলানা তোমার মতো সাহস করে আমার কাছে তাদের মনে সংশয় থাকলেও তা প্রকাশ করবে না। তোমার সৎ সাহস আছে, তাই তুমি করেছো। মনে সংশয় নিয়া তুমি যদি আমার পিতার মঙ্গল কামনা করে কোরান শরীফ পড়তা, তাতে আল্লাহ নারাজ হতেন। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছো। আমার প্রিয় পিতার আখিরাতের মঙ্গলের জন্য আমি নিজেই কোরআন শরীফ পড়বো। তুমি আশেপাশে থাইকো, কোথাও কোনো ভুল হইলে আমারে বইলো।
আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, বঙ্গবন্ধু নির্ভুলভাবে, পবিত্র মনে সেদিন কোরআন শরীফ পাঠ করেছিলেন। ঘটনাটির কথা বলার সময় মৌলানা শেখ হালিমের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
আমি বললাম, আপনি কাঁদছেন কেন?
তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুর আার্থিক সততা নিয়ে মনে সন্দেহ পোষণ করাটা আমার উচিত হয়নি। আমি সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাঁর মনে একটা খুব বড়ো রকমের কষ্ট দিয়েছি।
তাঁকে কবর দিয়ে ঘরে ফেরার পর থেকে আমি যখনই তাঁর কথা ভাবি, যখনি আমি তাঁর পিতা, মাতা এবং বঙ্গবন্ধুর কবরের কাছে যাই, তখনই ঐ ঘটনাটার কথা আমার মনে পড়ে। আমার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনা। তাঁর আর্থিক সততা ও সঙ্গতি নিয়ে সন্দেহ করার জন্য আমি পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে মাফ চাই।”
–কবি নির্মলেন্দু গুণ


