নঈম নিজামঃ মুজিবকে সতর্ক করতে র প্রধানকে পাঠান ইন্দিরা
বঙ্গবন্ধু কি জানতেন তাকে হত্যা করা হবে? জানার পরও কেন তিনি ছাড়লেন না ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের বাড়ি ? কেন নিলেন না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা? কেন শুনলেন না কথা?
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভ্যুত্থান ও হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর তৎকালীন প্রধান আর এন কাও, ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, বিশ্বাসভাজন ও জীবনীকার পুপুল জয়াকরের এবং ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক ব্যানার্জির লেখনিতে এই সতর্কবার্তার কথা রয়েছে।
১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠাতা প্রধান রমেশ্বর নাথ কাও খবর পান ঢাকায় ষড়যন্ত্র হচ্ছে । বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে খুনের পরিকল্পনা করছে সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার। আর এন কাও বিষয়টি জানান ইন্দিরা গান্ধীকে। সব শুনে ইন্দিরা চিন্তিত হলেন। তিনি ঢাকায় পাঠান ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানকে ।
১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের গোয়েন্দা প্রধান আর এন কাও ছদ্মবেশে ঢাকায় মুজিবের সাথে দেখা করেন। তিনি আসন্ন বিপদ এবং সেনা কর্মকর্তাদের চক্রান্তের সুনির্দিষ্ট তথ্য মুজিবের সামনে তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব শুনলেন। তিনি আর এন কাও কে বললেন, দেশের মানুষ তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী ও আর এন কাও এর সতর্কবার্তাকে হেসেই উড়িয়ে দেন। সতর্কতার জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ” সেনা অফিসাররা আমার নিজের সন্তানের মতো, ওরা আমার কোনো ক্ষতি করবে না”। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
১৯৮৯ সালে ভারতের ইংরেজি সাপ্তাহিক সানডের ২৯ এপ্রিল সংখ্যায় র’এর ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। আর এন কাও এর কিছু অংশের প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সেখানেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা এবং তাঁদের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দেওয়ার কথা তিনি জানান। এমনিতে আর এন কাও খুব একটা মুখ খুলতেন না। কিন্তু সংবাদ প্রকাশিত হলে এর ব্যাখ্যা বা প্রতিবাদ হিসেবে তিনি সব কথা তুলে ধরেন।
আর এন কাও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে আমি ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা যাই। এই সফরকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার সময় আমি তাঁকে পায়চারি করতে করতে বঙ্গভবনের বাগানে যেতে অনুরোধ করি। সবার অগোচরে নিয়ে গিয়ে আমি আমার তথ্য তাঁকে জানাই যে তাঁর জীবন হুমকির মধ্যে রয়েছে। তিনি সে সময় আনন্দপূর্ণ একটি পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, “ওরা সবাই আমার নিজের ছেলে। আমাকে আঘাত করবে না।” আমি কোনো ধরনের তর্কের মধ্যে না গিয়ে কেবল বললাম, আমাদের তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং এই ষড়যন্ত্রের যেসব তথ্য পেয়েছি, তা বিস্তারিত পাঠাতে পারব।’
আর এন কাও এরপর লেখেন, ‘এই আলোচনার অংশ হিসেবেই ১৯৭৫ সালের মার্চে আমি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠাই। তিনি ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যেসব তথ্য আমাদের কাছে আছে, সে অনুযায়ী তাঁকে জানান যে সেনাবাহিনীর দুটি ইউনিট, বিশেষ করে গোলন্দাজ (আর্টিলারি) ও অশ্বারোহী বাহিনী (ক্যাভালরি) তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু দুঃখজনক যে শেখ মুজিব আমাদের সব সতর্কতাই উপেক্ষা করেছিলেন।’(অসমাপ্ত )
নঈম নিজাম,সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক।


